বাবার মুক্তিযোদ্ধা সনদ জমা দিতে পারেননি ইবি ভিসির পিএস রেজা

প্রকাশিত: ৭:১৭ অপরাহ্ণ, জুন ২১, ২০২০

বিশেষ প্রতিনিধি॥ করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই সরকার ও মন্ত্রীদের নিয়ে নানা কটুক্তির জেরে শিক্ষার্থীদের বহিস্কার করছে ইবি প্রশাসন। এমনকি টেন্ডার দেয়ার মতও কাজ চলছে। দৈনন্দিন দাপ্তারিক কাজও চলমান। করোনার মধ্যেই ইবি প্রশাসন যখন অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে ঠিক সে সময় রেজার বিষয়ে নিশ্চুপ।

তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো বাবার মুক্তিযোদ্ধা সনদ জমা না দিয়েও বহাল তবিয়তে আছেন ইবি ভিসির পিএস (উপ-রেজিস্ট্রার) রেজাউল করিম রেজা। তার বিষয়ে কোন কান মাথা নাড়ছেন না ভিসিসহ প্রশাসন। বরং রেজার যত অপকর্ম রয়েছে তা জায়েজ করার চেষ্টা করছেন ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারি।

এ নিয়ে ক্ষোভে দেখা দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের মাঝে। তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।

জানা গেছে, রেজাউল করিম (রেজা) ভিসির পিএস (উপ-রেজিস্ট্রার) এবং ভিসির অত্যন্ত আস্তাভাজন কর্মকর্তা। তিনি ভিসির সকল ভাল-মন্দো কাজের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী। এজন্য রেজার বিরুদ্ধে শত অভিযোগ উঠলেও তা আমলে নিতে নারাজ ভিসি।

২০০৯ সালের ২১ অক্টোবর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে রেজাউল করিম রেজা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় আবেদন করেন। নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষে তিনি ২০১০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসে সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করেন। উক্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছিল যে, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০% কোটা সংরক্ষণ করা হবে। প্রমাণপত্র হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক ইস্যুকৃত প্রত্যায়ন পত্র, সাময়িক, মূল সনদপত্র আবেদন পত্রের সাথে সংযুক্ত করতে হবে।

তবে প্রত্যয়নপত্র দাখিলকারী মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের নিয়োগ বাছাই বোর্ডে উপস্থিত হওয়ার সময় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক ইস্যুকৃত সাময়িক ও মূল সনদপত্র আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে রেজা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির প্রধান শর্ত ভঙ্গ করেন। তিনি তার আবেদনের সাথে প্রত্যায়ন পত্র, সাময়িক ও মূল সনদপত্র কোনটায় সংযুক্ত করেন নি।

চলতি বছরের শুরুতেই বিষয়টি নিয়ে দেশের বিভিন্ন শীর্ষ পর্যায়ের মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে সংবাদ প্রকাশিত হয়। তখন ভিসি ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারী বলেছিলেন যে, চলতি বছরের ২৬ মার্চের মধ্যে রেজাউল করিম (রেজা) নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত মোতাবেক তার পিতার বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক ইস্যুকৃত সাময়িক সনদপত্র জমা দিবেন।

জমা দিতে ব্যার্থ হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ২৬ মার্চের পর আরও কয়েক মাস অতিহাবিহত হলেও আজও সেই সনদ জমা দেননি রেজা।

এদিকে রেজা নিজেই তার পিতাকে বিতর্কে জড়িয়ে ফেলেছেন। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা শীর্ষক একটি গ্রন্থে মোঃ রেজাউল করিম রেজা ১৯৯৯ সালের ৩০ আগস্ট তার দেয়া বয়ানে বলেছেন, তার পিতা আব্দুস ছোবহান, পিতা-মৃত কিতাব আলী, মাতা-হালিমা খাতুন, জন্ম-গ্রাম-বিন্দাহ, থানা-চৌহালী, জেলা-পাবনা। বর্তমান ঠিকান : গ্রাম – মুকুন্দগাতী, ডাকঘর-শেরনগর, থানা-বেলকুচি, জেলা-সিরাজগঞ্জ। তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কনস্টেবল পদে গোয়ালন্দগাট জিআরপি ফাঁড়িতে কর্মরত ছিলেন, কনস্টেবল নং-৪৭৯।

তিনি ১৯৭১ সালের ৮ মে কর্মরত অবস্থায় অবাঙালি পুলিশের হাতে কর্মস্থলে শাহাদতবরণ করেন। এখানে প্রশ্ন উঠেছে যে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ভোর রাতে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সেই ঘোষণা অনুযায়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল বীর সেনারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

রেজার তথ্য অনুযায়ী তার পিতা ৮ মে কর্মরত অবস্থায় শাহাদতবরণ করেন। তাহলে তিনি তখন কোন দেশের পুলিশ বাহিনীর সদস্য হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং কোন সরকারের বেতন ভোগ করতেন, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এছাড়াও রেজা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় চাকুরীতে যোগদান করেন ২০১০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর অথচ তার পিতার নাম মুক্তিযোদ্ধা গেজেটভূক্ত হয় ২০১১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। অর্থাৎ চাকুরীতে যোগদানের ১ বছর পরে। আবার তার পিতাকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা দাবী করা হলেও দেখা যায় তার পিতার নাম শহীদ/সামরিক কোন গেজেটে নেই, বরং বেসামরিক গেজেটে গেজেটভূক্ত হয়েছে, গেজেট নং-২৮৯৪। এছাড়া যে ব্যক্তি সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণই করেন নি, তাঁকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করা হয় কি ভাবে তা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা প্রশ্ন তুলেছেন?

রেজা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত মোতাবেক বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সনদ ছাড়াই প্রায় ১০ বছর চাকুরী করে চলেছেন। আর বিষয়টি সব জেনেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিরব।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুল লতিফ বলেন,‘ এখন পর্যন্ত রেজা কোন সদন জমা দেননি। ২৬ মার্চ দেওয়ার কথা থাকলেও ২১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। এরপর অরো কয়েক মাস অতিবাহিত হলেও আমার কাছে কোন সনদ জমা হয়নি।’

আর সনদ জমা দেয়ার বিষয়ে জানতে ভিসির পিএস রেজাউল করিম রেজার মোবাইলে রোববার রাত ৮টার দিকে দুইবার (০১৭১১০৫৯৩৫৯) নম্বরে রিং দিলেও ফোন রিসিভ করেননি।