COVID’19 এবং হোমিওপ্যাথি

প্রকাশিত: ৯:৫৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ২, ২০২০

আজ করোনার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করবো।যারা আমার বিগত লেখাটা পড়েছেন তারা অনেকেই মনে করবেন, আবার হোমিওপ্যাথি ক্যান? এই প্রশ্নের জবাবে একটু ভুমিকা না দিলে নয়।।

আমার শ্রদ্ধেয় পিতা মরহুম ডাঃ খোরশেদ আলম ছিলেন একজন প্রথিতযশা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। সেই ছেলেবেলা থেকেই কিছু হোমিওপ্যাথিক ঔষধের নাম আমাদের পরিবারের সবাই কম বেশি জনতাম। আমাদের কোন অসুখ হলে আব্বা হোমিওপ্যাথিক ঔষধ দিতেন। ঠিক তখন থেকেই হোমিওপ্যাথির প্রতি ভালবাসা। এর পর যত দিন যেতে লাগলো ততই হোমিওপ্যাথিকে ভালো লাগতে লাগলো। যখন দেখতাম আব্বার কাছে প্রতিদিন অনেক রোগী আসে, তখন মনে হতো একদিন আমিও বড় হয়ে আব্বার মত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হবো। একদিন আব্বাকে সাহস করে বলেই ফেললাম আমার ইচ্ছার কথাটা। প্রতিউত্তরে আব্বা বললেন ভালো হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হতে হলে আগে Allopathy পড়তে হবে। আব্বা নিজেও প্রথম জীবনে Allopathy চিকিৎসক ছিলেন। শুরু হলো প্রস্তুতি এবং অপেক্ষা। পাশাপাশি অবসর সময়ে বাবার চেম্বারে সহকারী হিসাবে কাজও শুরু করলাম। একদিন আল্লাহর ইচ্ছায় দেশের একটা নামকরা মেডিকেলে ভর্তির সুযোগও পেয়ে গেলাম। যথারীতি লেখাপড়া শেষ করে আব্বার কাছে বললাম এবার কি করবো? আব্বা উত্তরে হোমিওপ্যাথি ডিগ্রি নিতে বললেন এবং পাশাপাশি সরকারি চাকরি নিতে বললেন। কারণ সরকারি চাকরি না করলে ভবিষ্যতে সকলে বলবে কোনরকমে মেডিকেল পাশ করেছে এবং কোথাও চাকরি পায়নি বলে হোমিওপ্যাথি করছে।আব্বার সেদিনের দুরদর্শিতা আজ আমাকে অনেক সম্মানিত করেছে। যথারীতি সরকারি চাকরি নিলাম। হোমিওপ্যাথি ডিগ্রিও অর্জন করলাম। পাশাপাশি হাতে কলমে বাবার কাছে দীক্ষা নিতে থাকলাম। দীর্ঘ ২২ বছর বাবার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থেকে অনেক কিছুই শিখলাম এবং বাবার মৃত্যুর পর পরই চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে বাবার ইচ্ছানুযায়ী আব্বার চেম্বারের দায়িত্ব নিলাম। কাজেই আমি Converted Homoeopath নই।হোমিওপ্যাথিকে সঠিকভাবে প্রয়োগের জন্য MBBS এর knowledge টা আমার অনেক কাজে দিচ্ছে।

বেশ কিছুদিন ধরে আমার বেশ কিছু Followers, Patients, Friends এবং Well-wishers চাচ্ছিলেন আমি যেন করোনার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা সম্পর্কে কিছু লিখি, তাই আজকের এই প্রয়াস।
প্রথমেই বলে নিচ্ছি MBBS পাস করেছি ২০ বছর আগে এবং DHMS পাস করেছি ১৫ বছর আগে আর বাবার কাছে দীক্ষা নিয়েছি ২২ বছর অথচ কিছুই শিখতে পারিনি। প্রতিনিয়তই শিখছি। কাজেই যা লিখছি তা আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার আলোকে। যারা দেশের এবং বিদেশের প্রথিতযশা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক তাঁরা আমার থেকে অনেক বেশি জানেন তাই তাদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই আমি সম্পুর্ন আমার নিজস্ব মতামতটাই তুলে ধরছি।

❓ একটি প্রশ্ন অনেক আগে থেকেই অনেকে আমাকে করেছেন। সেটা হলো Arsenic কি খাবো? এটাতে কি প্রটেকশন দেবে? সেই সঙ্গে আবার কেউ কেউ Camphor এর কথাও জানতে চেয়েছেন। আমার উত্তর হলো, যে Basic Principle এর উপর Homoeopathy দাড়িয়ে আছে তা হলো ” Treat The Patient & Not The Disease”. অর্থাৎ রোগের নয় রুগীর চিকিৎসা। তাহলে যে এখনও রুগীই হয়নি তার চিকিৎসা কি করে হয়? হোমিওপ্যাথি হলো লক্ষ্মণ ভিত্তিক চিকিৎসা তাই যার এখনও লক্ষ্মণই প্রকাশ পায়নি তার চিকিৎসা আমি দেব কিসের ভিত্তিতে? যারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের লক্ষ্মণ দিয়ে যারা আক্রান্ত হয়নি তাদের চিকিৎসা! এটা কি Prophylactic treatment নাকি Vaccination? হোমিওপ্যাথিতে এই ধরনের কোন কথা আমি কোন বইতে পাইনি। আর Vaccination বা Prophylactic treatment কে established করতে গেলে যে সকল Comparative Study দরকার তা কি করা হয়েছে? আবার এত অল্প সময়ে যেখানে Disease টা পৃথিবীতে এসেছেই মাত্র কয়েক মাস, সেখানে নির্দিষ্ট Area, subject ইত্যাদি selection নাকরেই কি আমি prophylaxis শুরু করে দিতে পারি? অনেকে আবার বলছেন Arsenic খাওয়ালে রোগ আক্রমনের সংখ্যা এবং তীব্রতা কম হবে, এর কোন Proving বা কোন ধরনের Data Analysis Report কি আপনার কাছে আছে? তাহলে কিসের ভিত্তিতে এই সব কথা?

হোমিওপ্যাথিতে দর্শন বা Inspection কে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যে কারণে রোগীর চেহারা, জিহবা, নখ, দেহাবয়ব ইত্যাদি দেখে, রোগের ইতিহাস শুনে এবং বংশের রোগের বিবরণ শুনে সর্বাধিক লক্ষ্মণ সাদৃশ্য যুক্ত ঔষধ নির্বাচন করা হয়। করোনার ক্ষেত্রে সকলকে শুধু Arsenic প্রয়োগ করলে কি উপরোক্ত নীতি অনুসরণ করা হলো?— কাজেই আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো Homoeopathy তে Preventive Treatment এ আমি একমত নই।। কথা প্রসঙ্গে না বললেই নয় যে বাংলাদেশ সরকারের অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ আমাকে Arsenic সম্মন্ধে প্রশ্ন করেছেন আমি সকলকেই উপরোক্ত উত্তর দিয়েছি এবং বলেছি খাইলে ক্ষতি নাই তবে Arsenic খেয়ে একেবারে নিশ্চিন্ত থাকলে বড় ভুল হবে।

দেখুন একটি Vaccine বা Antibiotic যদি কাজ না করে তাহলে সেটার লট বাতিল হয়, QC বাতিল হয় বা Manufacturing Company টি Black listed হয়, হোমিওপ্যাথির এই Arsenic খাওয়ার পরও যখন COVID (+ve) হবে (already অনেকেরই হয়েছে) তখন পুরো হোমিওপ্যাথির উপর দোষ পড়বে। এটা কি ঠিক হবে? ডাঃ খোরশেদ আলম এর মত যেসব কিংবদন্তি চিকিৎসক অক্লান্ত পরিশ্রম করে হোমিওপ্যাথিকে বাংলাদেশের বুকে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন, আমাদের সকল হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের উচিৎ সেটিকে আরও Uphold করা। কাজেই বন্ধুরা আসুন Prevention নিয়ে সময় নষ্ট না করে আমরা COVID (+ve) রুগীর চিকিৎসা নিয়ে ভাবি। Arsenic বা অন্যান্য হোমিওপ্যাথিক ঔষধ তৈরির সবচেয়ে ভালো কোম্পানি এখন জার্মানিতে অথচ সেখানে এখন করোনা রুগীর সংখ্যা কত? এই কথা দিয়েই মনে হয় বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা সব বুঝে যাবেন।।

তাহলে করোনার চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি কি অবদান রাখতে পারবে না? অবশ্যই পারবে ইনশাআল্লাহ। আমরা জানি If there is signs and symptoms then of course there is Homoeopathic Medicine– যেহেতু হোমিওপ্যাথি রোগের নয় রুগীর চিকিৎসা করে কাজেই লক্ষ্মণ প্রকাশ পেলে যে রোগই হোকনা কেন তার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা অবশ্যই আছে। এটা আমি আমার চিকিৎসা জীবনে খুবই গভীর ভাবে উপলব্ধি করছি। যে সকল রুগী হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিয়ে বলে দেওয়া হচ্ছে আর কিছু করার নেই, সেই সব রুগী আমিও সরকারি হাসপাতালে চাকরি করার সময় একই কথা বলতাম, অথচ এখন ঐসব রোগীই আল্লাহর ইচ্ছায় হোমিওপ্যাথিতে সুস্থ হয়ে যাচ্ছে। আমার অসংখ্য রুগী যার মধ্যে সরকারি হাসপাতালের কিছু উচ্চপদস্থ চিকিৎসক এবং অন্য পেশার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও আছেন, তারা এর জীবন্ত স্বাক্ষী। কাজেই আমরা করোনার বিভিন্ন লক্ষ্মণ ভিত্তিক ঔষধ গুলো বের করার চেষ্টা করি। যে রুগীর লক্ষণের সাথে যে ঔষধের মিল হয় তাকে সেই ঔষধ প্রয়োগ করি। আর শুধু জ্বরের চিন্তা করলেও হবেনা, জ্বর পরবর্তী Complications যেমন– কাশি, শ্বাসকষ্ট, রক্ত জমাট বাঁধা,Consolidation, Fibrosis ইত্যাদি বিষয়কে মাথায় রেখে কোন Deep seated Medicine দেওয়া যায় কিনা সেটাও চিন্তার বিষয়। যে রোগীর সাথে Arsenic এর লক্ষ্মণ মেলে তাকে Arsenic দেওয়া যেতে পারে, তদ্রূপ Bryonia এর লক্ষ্মণ থাকলে Bryonia, Gelsemium এর লক্ষ্মণ থাকলে Gelsemium, China এর লক্ষ্মণ থাকলে China ইত্যাদি ঔষধ দেওয়া যেতে পারে। আমার কাছে ইতোমধ্যে অনেক রুগী আসছে এবং আমি অনেক ভালো Result পাচ্ছি ইনশাআল্লাহ। তবে এক ঔষধে নয়, একাধিক ঔষধ লাগছে। আমি Database এ Record keeping ও করছি পরবর্তীতে জানাবো ইনশাআল্লাহ।

এর বাইরে কারো কিছু জানার থাকলে আমাকে প্রশ্ন করলে আমি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

তবে সকলকে আমার আগেত পোস্টটা পড়ার অনুরোধ করবো, কারণ ওখানে ঔষধের বাইরেও কিছু করনীয় সম্পর্কে আলোচনা আছে যেটা উপকারে আসবে।

পরিশেষে মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানায়, রাব্বুল আলামীন আপনি নিজগুনে আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন, এই মহামারী থেকে আমাদেরকে রক্ষা করুন, করোনাভাইরাস এর ক্ষমতা ধ্বংস করে দিন এবং আমাদের প্রদত্ত ঔষধের মাধ্যমে সকল করোনা রুগীকে সেফা দান করুন–আমিন।

লেখক: ডা: এস এম রবিউল আলম